দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন উপদেষ্টাকে জানিয়েছেন, যুদ্ধ আরও বাড়ালে তা উল্টো ফল দিতে পারে। শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করাও কঠিন বলে মনে করছেন তিনি।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। একটি সূত্র সরাসরি বলেছে, ‘কেইন যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন।’
সূত্রগুলো জানায়, যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ শুধু কেইনের একার নয়। তিনি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক জন র্যাটক্লিফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সামরিক অভিযান আরও বাড়ানোর সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগে এসব কর্মকর্তার সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনার মাধ্যমে কেইন সামরিক বিকল্পগুলোর সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি তুলে ধরছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের সরাসরি ইরানে না পাঠিয়েও যুদ্ধ বাড়ানোর বিভিন্ন পথ রয়েছে।
একটি সূত্রের ভাষ্য, ‘তিনি সামরিক বাহিনীকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছেন।’
ট্রাম্প ইরানে স্থলসেনা পাঠানোর ধারণার প্রতি অনাগ্রহী। বরং আকাশপথে ব্যাপক হামলা চালিয়ে ইরানকে তার শর্তে সমঝোতায় বাধ্য করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। তবে কেইনসহ ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আলোচনায় মনে করছেন, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা কম।
প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ধ্বংস করার দাবি করা হলেও এখনো সংঘাতের অবসান হয়নি। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই ট্রাম্পের ঘোষিত প্রধান লক্ষ্য। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার যুদ্ধের সহজ সামরিক সমাধান নেই বলে ব্যক্তিগতভাবে মত দেওয়া তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেইনের মুখপাত্র জোসেফ হলস্টেড এ বিষয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট, প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিংবা অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে চেয়ারম্যানের গোপন আলোচনা নিয়ে তারা মন্তব্য করেন না।
হোয়াইট হাউস অবশ্য কেইনের ভূমিকার প্রশংসা করেছে। এক কর্মকর্তা বলেন, প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা দলের জন্য জেনারেল কেইন ‘অসাধারণ সম্পদ’। তিনি আরও বলেন, কেইন প্রেসিডেন্টকে সঠিক ও নিরপেক্ষ তথ্য এবং বিভিন্ন বিকল্প তুলে দেন; শেষ পর্যন্ত জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা প্রেসিডেন্টই নির্ধারণ করেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সামরিক অভিযান বাড়ানোর আগে সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনা করা জরুরি। গত মাসের শেষ দিকে আইনপ্রণেতাদের এক প্রকাশ্য শুনানিতে কেইনও বলেছিলেন, ‘আকাশশক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’
এই কারণেই জুলাইয়ের শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় ও আগ্রাসী হামলার পরিকল্পনা নিয়ে কেইনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা সতর্ক ছিলেন। ওই সময় ট্রাম্প একটি ‘বিরাট’ অভিযান অনুমোদনের দিকে এগোলেও পরে তা থেকে সরে আসেন।
একটি সূত্র জানায়, ওই অভিযানের পক্ষে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সামরিক কমান্ডের কিছু অংশ ছিল। ইসরায়েলও মোটের ওপর অভিযানটি বাড়ানোর পক্ষে ছিল।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত হামলা থেকে সরে আসেন। মিত্ররা আশঙ্কা প্রকাশ করে, ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত করতে পারে। তবে ভবিষ্যতে ওই ধরনের হামলার পরিকল্পনা পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়াও যুদ্ধ আরও বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। কেইনের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারাও মার্কিন প্রশাসনকে জানিয়েছেন, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা ঠেকানো কঠিন হতে পারে।
ট্রাম্প বারবার ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়েছেন। তবে সূত্রগুলো বলছে, এতে ইরান আত্মসমর্পণে বাধ্য হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে না গিয়ে আরও সরকারের পক্ষেই অবস্থান নিতে পারে বলেও মনে করছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।
ইরানের সেতুতে হামলার বিষয়টিও ট্রাম্প বিবেচনা করেছেন। তবে এ ধরনের হামলাও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়েও সতর্ক রয়েছেন কেইন। প্রেসিডেন্টের কাছে সামরিক বিকল্পগুলোর নেতিবাচক দিক তুলে ধরার সময় তিনি সতর্কতার সঙ্গে বিষয়গুলো উপস্থাপন করছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
গত মাসের শেষ দিকে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকেও কেইন সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের ঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কমে যাওয়া গোলাবারুদের মজুত নিয়ে সতর্ক করেন।
তবে একই বৈঠকে তিনি প্রেসিডেন্টকে এটিও জানান, ট্রাম্প যদি অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে মার্কিন বাহিনী ইরানের ব্যাপক ক্ষতি করতে সক্ষম।
ব্যক্তিগত আলোচনায় অবশ্য কেইন আকাশশক্তির সীমাবদ্ধতার বিষয়টি আরও সরাসরি তুলে ধরেছেন। তার মতে, যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে শুধু বোমা হামলা চালিয়ে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগেও কেইন ও অন্যান্য সামরিক কর্মকর্তা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইসরায়েল ও ইউক্রেনকে সরবরাহ করা অস্ত্রের ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ছিল।
এখন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ দেশটির গোলাবারুদের মজুতকে ‘বিপজ্জনকভাবে কম’ বলে মনে করছেন। এই ঘাটতি ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতাকেও দুর্বল করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গোলাবারুদের ঘাটতি মোকাবিলায় পেন্টাগন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সামরিক কমান্ড তাদের সামরিক কৌশল নতুন করে পর্যালোচনা করছে। এমনকি ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো ও শাস্তি দেওয়ার নতুন এবং প্রচলিত পদ্ধতির সন্ধানেও কর্মকর্তাদের কাছে মতামত চাওয়া হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পর এভাবে নতুন কৌশলের সন্ধানকে পরিস্থিতি ভালো যাচ্ছে না—এমন একটি পরোক্ষ স্বীকারোক্তি হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে প্রশাসনের অনেকেই মনে করছেন, ইরানকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে হলে স্থলসেনা নিয়ে বড় ধরনের অভিযান প্রয়োজন হতে পারে। এতে হাজার হাজার মার্কিন সেনার প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে। এ ধরনের পরিকল্পনা পেন্টাগনের কাছে থাকলেও বর্তমানে প্রশাসনের কেউই এমন চরম পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন না।
তাই যুদ্ধ আরও বাড়ানোর বদলে ট্রাম্পকে একটি ‘প্রতীকী বিজয়’ দেওয়ার মতো সমঝোতার পথ খোঁজা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দেশের জনগণের কাছে অর্জন হিসেবে কিছু তুলে ধরতে পারবেন এবং একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা থাকবে। সেই প্রক্রিয়ার শুরু হতে পারে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতার মাধ্যমে।
/অ